একসময় আমেরিকাতেও মদ নিষিদ্ধ ছিলো

একসময় আমেরিকাতেও মদ নিষিদ্ধ ছিলো


আমেরিকা তখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের উপনিবেশ। ১৭৭০ সালের কথা, আমেরিকায় অবস্থানরত কলোনিয়ানরা বছরে গড়ে ১৪ লিটার মদ পান করত। ১৮৩০ এ তা দ্বিগুণে উন্নীত হয়। অর্থাৎ সেসময় কলোনিয়ানদের পনেরোর্ধ্ব প্রতি একজন লোক বছরে ২৮ লিটার মদপানে অভ্যস্ত ছিলো। 


১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ অক্টোবর, সংবিধানের ১৮ তম সংশোধনীর মাধ্যমে আমেরিকান কংগ্রেস 'মদ'কে বে-আইনী ঘোষণা ক'রে একটি নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এর নাম দেওয়া হয় 'Volstead Act'। কিন্তু এর জনপ্রিয় নাম হলো 'National Prohibition Act'। যদিও এ আইনে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসনের ভেটো ছিলো। ১৯২০ হতে ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত মদ তৈরি, বিপনন, আমদানি এবং পরিবহন পুরোপুরি নিষিদ্ধ ছিল। আমেরিকার এই সময়কালকে 'Prohibition Era' বলা হয়। 


Anti Saloon League [বর্তমানে এর নাম [American Council on Addiction and Alcohol Problems]  নামে একটি সংস্থা কয়েক বছর ধরে পত্রিকা, প্রচারপত্র, ছায়াছবি এবং অন্যান্য নানাবিধ উপায়ে আমেরিকানদের মন-মগজে মদের অপকারিতা বদ্ধমূল করে দেবার চেষ্টা চালিয়েছিলো। অনুমান করা হয় যে, আন্দোলনের সূচনা থেকে ১৯২৫ সাল পর্যন্ত শুধু তাদের প্রচারকার্যেই ব্যয় হয় সাড়ে ছয় কোটি ডলার এবং মদের অপকারিতা বিষয়ে বই, প্রচারপত্র ও পত্রিকার পৃষ্ঠা সংখ্যা ছিল নয়শো কোটির মতো। 


মদ নিষিদ্ধের প্রতি আমেরিকানরা ততদিন পর্যন্ত সমর্থন জানিয়েছিলো, যতদিন বিষয়টি বই-পত্রিকা ও বক্তৃতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো। কিন্তু যখনই এটি আইনে রূপান্তরিত হলো এবং বাস্তবায়নের পালা এলো, মদ হারানোর ভয়ে তাঁরা আতঙ্কিত হয়ে উঠলো।


তাঁরা মদ হারানোর ভয়ে এতোটাই পাগলপারা হয়েছিলো- যেদিকে নিষিদ্ধ ঘোষণার পূর্বে মদ সাপ্লাইয়ের জন্য অনুমোদিত দোকানের সংখ্যা ছিলো চারশ'। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার পরবর্তী ৭ বছরের মধ্যে ৯৩,৮৩১টি মদের কারখানা বাজেয়াপ্ত এবং ৭৯,৪৩৭ জন কারখানা মালিককে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে এটি ছিলো সর্বমোট কারখানা ও দোকানের এক-দশমাংশ মাত্র। যেটি ছিলো পূর্বে শহর কেন্দ্রিক, এখন তা গ্রামগঞ্জসহ মানুষের ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে জনজীবনে যে বিপর্যয় নেমে এসেছিলো, তা একটি উদাহরণের মাধ্যমে অনুমেয়। 


আমেরিকার অনেক মানুষ, বিশেষ করে যারা সচ্ছল এবং সুবিধাভোগী, তাঁরা এই আইন একেবারেই মানতো না। এমনকি প্রেসিডেন্ট ওয়ারেন হার্ডিং নিজেও হোয়াইট হাউজে প্রকাশ্যে মদ পরিবেশন করতেন। 


মদ নিষিদ্ধ করার আগে শুধু নিউইয়র্ক শহরে মদ্যপানে শারীরিক জটিলতায় ভুক্ত রোগীর সংখ্যা ছিলো ৩,৭৪১ জন এবং মৃতের সংখ্যা ছিলো ২৫২ জন। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা জারির পর এই সংখ্যা যেন মহাকাশ ছুঁই-ছুঁই। 

১৯২৬ সালে রোগাক্রান্তের সংখ্যা ১১,০০০ এবং মৃত্যুর সংখ্যা ৭,৫০০ এ উন্নীত হয়। এ পরিসংখ্যান কিন্তু পুরো আমেরিকার নয়, কেবলমাত্র নিউইয়র্ক সিটির। তাহলে পুরো আমেরিকার কী অবস্থা দাঁড়িয়েছিলো ?! তাছাড়া দেশে অপরাধের মাত্রা কল্পনাতীতভাবে বেড়ে যায়। ১৯৩৩ সালের দিকে আমেরিকার Crime Council এর ডিরেক্টর কর্নেল মোস বলেন, 

"বর্তমানে আমেরিকার প্রতি তিনজনে একজন পেশাদার অপরাধী। তার উপরে আমাদের এখানে হত্যাকাণ্ডের অপরাধ শতকরা সাড়ে তিনশ' ভাগ বেড়ে গিয়েছে।" 

১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দের ২২ মার্চ, প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট Cullen–Harrison Act এ স্বাক্ষর করেন। এ আইনের মাধ্যমে আমেরিকায় মদ বিক্রি ও বিপননকে বৈধ ঘোষণা করা হয়।

শেষমেশ, মদ নিষিদ্ধ করার আইনটি বাস্তবায়নের জন্য চৌদ্দটি বছর ধরে ব্যয় করা সব অর্থ ও শ্রম ডাস্টবিনে পতিত হলো।

একটি জরিপ থেকে জানা যায়, বর্তমানে আমেরিকার আঠারোর্ধ ৮৬ শতাংশ লোক জীবনের কোনো না কোনো সময় মদ পান করেছেই। ৬ শতাংশেরও বেশি আমেরিকান মদ্যপানের বিভিন্ন জটিলতায় ভুগছেন। পুরুষদের মধ্যে এর সংখ্যা প্রতি ১২ জনে ১ জন এবং নারীদের মধ্যে এর সংখ্যা প্রতি ২৫ জনে ১ প। এর চেয়েও ভয়ানক বিষয় হচ্ছে- এদের মধ্যে ৬,২৩,০০০ জনের বয়স ১২ থেকে ১৭ এর মধ্যে। 

শুধু আমেরিকাতেই প্রতি বছর মদপানে প্রায় ৮৮ হাজার লোক মারা যায়। গবেষকদের মতে, মদ্যপানে অভ্যস্ত মানুষ সহিংস ও আত্মঘাতী হয়ে ওঠে। আমেরিকায় একের পর এক বন্দুক হামলা ও আত্মঘাতী হামলাই এর প্রমাণ বহন করে। তাছাড়া পৃথিবীতে মদ্যপানে প্রতি বছর ২৮ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়। যেন এক মহামারী ! 


এতক্ষণ তো গেলো বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীরর মতো আধুনিক যুগে পৌঁছেও চেতনার টাইটেলধারী আমেরিকার মদ নিষিদ্ধ ও এর বর্তমান অবস্থা নিয়ে নানা আলাপ। এতো এতো চেষ্টার পরেও তাঁরা কিছুতেই মদকে নিষিদ্ধ করতে পারলো না। এখন মদ নিষিদ্ধের বিষয়ে ইসলামের সফলতা দেখা যাক।

তখন থেকে প্রায় সাড়ে তেরোশ' বছর আগে ঠিক এমনই একটি নিষেধাজ্ঞা আরশে আযীমের অধিপতির কাছ থেকে অবতীর্ণ হয়েছিলো। কিন্তু তা বাস্তবায়নের জন্য কোনো পুলিশকে মাঠে নামাতে হয়নি, কোনো জেল-জরিমানা করতে হয়নি। শুধু 'মদ নিষিদ্ধ হওয়া'র একটি ইলাহী নির্দেশ।

[সূরা বাক্বারাহ (২), আয়াত ২১৯; সূরা নিসা (৪), আয়াত ৪৩; সূরা মায়িদাহ (৫), আয়াত ৯০]

"ঘোষকের শুধু একটি ঘোষণা,

أَلَا إِنَّ الْخَمْرَ قَدْ حُرِّمَت

"সাবধান ! মদ নিষিদ্ধ হয়েছে।"

আর এতেই পুরো মাদীনা মদে ভেসে গেলো ! 


উক্ত ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে আনাস (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, আমি আবু তালহা (রদিয়াল্লাহু আনহু) -এর ঘরে লোকদেরকে মদ পান করাচ্ছিলাম, তখনই মদের নিষেধাজ্ঞা অবতীর্ণ হলো। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) একজন ঘোষককে তা প্রচারের নির্দেশ দিলেন। এরপর সে ঘোষণা দিল।


আবু তালহা (রদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, বেরিয়ে দেখ তো কীসের শব্দ ?

আনাস (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, আমি বের হলাম এবং বললাম যে, একজন ঘোষক ঘোষণা দিচ্ছে যে, জেনে রাখো মদ হারাম করে দেয়া হয়েছে। 

এরপর তিনি আমাকে বললেন- যাও, এগুলো সব ঢেলে দাও।

আনাস (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, সেদিন মাদীনাহ মানওয়ারার রাস্তায় রাস্তায় মদের স্রোত প্রবাহিত হয়েছিল। [সহিহ বুখারি: ৪৬২০]

চেতনার ফেরিওয়ালা আমেরিকা বিংশ এবং একবিংশ শতাব্দীতে পৌঁছেও শত চেষ্টার মাধ্যমেও নিজ দেশে মদ নিষিদ্ধ করাতে পারলো না। অন্যদিকে নাবী () এর নাবুয়্যাত প্রাপ্তির মাধ্যমে আরবেরা সবে মাত্র জাহিলিয়্যাত থেকে মুক্ত হলো। আমি সে যুগের কথা বলছি, যখন আরবী ভাষায় কেবল মদেরই আড়াইশ' শব্দ ছিলো। এ থেকেই বোঝা যায়, আরবেরা মদের প্রতি কতটা আসক্ত ছিলো। কিন্তু আল্লাহর কালামের আলোয় তাঁরা এতটাই আলোকিত হলো যে, মদ নিষিদ্ধের ওয়াহী নাযিল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা তা পরিত্যাগ করলো। কেউ মুখের সামনে নিয়ে আসা মদের পেয়ালা ফেলে দিলো, কেউ আবার মুখে আঙ্গুল ঢুকিয়ে মদ বমি করে ফেলে দিলো। আল্লাহর আদেশের উপর তাঁরা কোনো যুক্তি বা অজুহাত উপস্থাপন করলো না।

Post a Comment

0 Comments

Translate

Contact Form

Name

Email *

Message *