ইতিপূর্বে কখনও কল্পনাও করিনি অধমকে এমন কিছু অপ্রিয় কথন লেখার অভিপ্রায়ে কলম ধরতে হবে। আমি মনে করি, এই সকল বিষয়ে কলম ধারণ আমার কর্ম নয়। সম্মানিত গুরুজনগণ যদি সঠিক সময়ে এই কাজটুকুর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতেন এবং তার পূর্ণতা দিতেন তবে আমার মতো অকাল কুষ্মাণ্ডের আর এই বিষয়ে কী-বোর্ডে চাপার প্রয়োজন হতো না। সত্যি বলতে, কোনো এক অদ্ভুত কারণে এই কাজের পূর্ণতা পায়নি। অথবা এই বিষয়টি আমি অধম যতটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করছি সম্মানিত গুরুজন মণ্ডলী হয়ত এটাকে ততটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন না।
সর্ব সাধারণের প্রতি সতর্ক পর্যবেক্ষণের ফলে দৃষ্টিগোচর হওয়া পরিস্থিতি যদি প্রতিনিয়ত খারাপের দিকে না যেত তবে হয়ত আমি এই আলোচনার সূত্রপাত করতাম না। উত্তরোত্তর পরিস্থিতির ভয়াবহতা বৃদ্ধি পাওয়ার দরুন আমার এই নিবন্ধ। যেকোনো প্রকার ভুলভ্রান্তি আন্তরিকতার সাথে ধরিয়ে দিলে আমি অবশ্যই অবশ্যই নিজেকে শুধরে নিতে আগ্রহী। আমি অধমের অযাচিত এসকল কথাবার্তা কার কতটা উপকারে আসবে জানি না তবে অপকার করবে না ইন শা আল্লাহ্।
আবু ত্বহা মুহাম্মাদ আদনান
প্রথম কথা, তিনি সেক্যুলার শিক্ষায় শিক্ষিত একজন যুবক। তিনি রংপুরের কারমাইকেল কলেজ থেকে দর্শন শাস্ত্রে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করেন। সেক্যুলার পড়াশোনা চলাকালীন সময়ে তিনি দ্বীনের বুঝ পান। আলহামদুলিল্লাহ্। পরবর্তীতে তিনি স্থানীয় একটি সালাফিয়া মাদ্রাসা থেকে আরবি শেখেন এবং নিজ উদ্যোগে প্রচুর পড়াশোনা করেন এবং অদ্যাবধি তা জারি রেখেছেন। এরই মধ্যে একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের ইসলামিক ট্যালেন্ট হান্ট প্রতিযোগিতা ‘আলোকিত জ্ঞানী’ নামক অনুষ্ঠানে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। অর্থাৎ এখন পর্যন্ত এই কথা সত্য যে, তার ইসলামের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কিংবা ডিগ্রী কোনটিই নেই।
ইসলামের কোনো প্রকার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকা সত্ত্বেও তিনি তার নিজ ইউটিউব চ্যানেলে বিবিধ সমসাময়িক ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিষয় ভিত্তিক নাসিহামূলক আলোচনা করতে শুরু করেন। এই সকল আলোচনার মাধ্যমে ইতিমধ্যেই তিনি জেনারেল পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের অনেকের কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন। এখানে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হচ্ছে, তার আলোচনায় বেশকিছু বিষয়ে তথ্যগত ভুল রয়েছে। হতে পারে সেগুলো জবান পিছলে যাওয়ার ফল কিংবা অনিচ্ছাকৃত জানার সীমাবদ্ধতার ভুল। সেগুলো নিয়ে সম্মানিত আলেম সমাজ ইতিমধ্যেই ফিকির করছেন। এইরূপ ভুলের আলোচনায় পরবর্তীতে আসছি।
এই মুহূর্তে আবু ত্বহা মুহাম্মাদ আদনানের জীবনের ঘটনা প্রবাহের দিকে নজর দেয়া যাক। উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে এটা পরিষ্কার যে, তিনি আগাগোড়াই জেনারেল পড়ুয়া একজন মানুষ। দ্বীনি পড়াশোনার প্রাতিষ্ঠানিক কোন ডিগ্রী তার নেই। এটাই কঠিন ও বাস্তব সত্য। এটা যেমন আবু ত্বহা মুহাম্মাদ আদনান নিজেও একবাক্যে মেনে নিবেন, তেমনি তার ভক্ত নয় একজন শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে আমিও তা স্বীকার করি।
এমতাবস্থায় আমাকে শুধু এতটুকু বলুন, এই দেশে কত শতাংশ মানুষ দ্বীনি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জন করে? আর কত শতাংশ মানুষ প্রচলিত সেক্যুলার সিস্টেমের আওতায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জন করে? আমি হলফ করে বলতে পারি, এই সংখ্যা ২০:৮০ এর বেশি হবে না। অর্থাৎ শতকরা প্রায় ৮০ জন সেক্যুলার শিক্ষায় শিক্ষিত আর মাত্র ২০ জন প্রাতিষ্ঠানিক ইসলামিক শিক্ষায় শিক্ষিত। এই শতকরা ৮০ জন জেনারেল শিক্ষিতের মধ্যে আবার সর্বোচ্চ মাত্র ১০ জন ইসলাম চর্চা করে। বাদবাকি শতকরা ৭০ জন শিক্ষার্থী যে কেবল সেক্যুলার শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছে এমন নয়, তারা সেক্যুলার চশমা দিয়ে বিশ্বকে দেখতে শুরু করেছে। শুধু তাই নয়, কুরআন এবং সুন্নাহকেও তারা সেক্যুলারিজমের মানদণ্ডে বিচার করতে শুরু করেছে। যা বর্তমানে উম্মাহর জন্য ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। তরুণ প্রজন্মের এমন চিন্তাধারা নিয়ে সম্মানিত আলেম থেকে শুরু করে দ্বীনের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র দাঈ পর্যন্ত সকলেই যারপরনাই চিন্তিত।
একটি বিষয় কী জানেন, মানুষ তাকেই অনুসরণ করে যার মধ্যে নিজের বৈশিষ্ট্যগত সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। এই যেমন ধরুন, শায়খ মিজানুর রহমান আজহারি জেনারেল শিক্ষার্থীদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পেয়েছেন তার সহজ সাবলীল বাচন ভঙ্গী, স্মার্ট ইংরেজি উচ্চারণ ও যুব সমাজের প্রয়োজন উপলব্ধি করার জন্য। তিনি রাজনীতির স্বীকার হয়ে দেশ ছাড়ার পর, এমন একজন মানুষের প্রয়োজন অনুভব করতে শুরু করে এই সকল তরুণ প্রজন্ম যারা সেক্যুলার শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েও ইসলামের প্রতি নরমদিল।
একজন কোনো প্রতিবন্ধকতার দরুন দ্বীনের খেদমত জারি রাখতে না পারলে আল্লাহ্ সুবাহানাহু তাআলা আরেক জনের দ্বারা সেই কর্মটুকু করিয়ে নেন। বাংলা ভাষাভাষীদের মধ্যে এই বক্তব্যের সবচেয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হচ্ছেন, ড. খন্দকার আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রহি.) এর স্থলে শায়খ আহমাদুল্লাহর জেগে ওঠা। আর সেক্যুলার শিক্ষায় শিক্ষিতদের মাঝে এর বাস্তব উদাহরণ শায়খ মিজানুর রহমান আজহারির স্থলে তরুণ দাঈ আবু ত্বহা মুহাম্মাদ আদনান। না, বিশ্বাস করুন, আমি তাদের মৌলিক ও অবস্থানগত তুলনা একদম করছি না। এইরূপ তুলনা তাদের ক্ষেত্রে একদমই মানানসই নয়।
একজন আলেম কিংবা শায়খ হিসেবে অনন্য আরেকজন দ্বীনের দাঈ হিসেবে অনন্য। অন্যদিকে একজন শায়খ দ্বীনের দাঈ হতে পারেন, কিন্তু একজন দাঈ যোগ্যতা অর্জন ব্যতিরেকে আলেম কিংবা শায়খ হতে পারেন না। আমি তুলনা করছি, তাদের মধ্যকার দ্বীনের দাঈ সত্ত্বার এবং সেটা কোনো ভাবেই নেতিবাচক অর্থে নয়।
সত্য স্বীকার করতে আমি কখনই কুণ্ঠিত হই না, ভবিষ্যতেও হবো না। আবু ত্বহা মুহাম্মাদ আদনান একজন অনন্য সাধারণ দ্বীনের দাঈ। তিনি কোনো আলেম নন। মানুষ হিসেবে তিনি ভুল ত্রুটির ঊর্ধ্বেও নন। এই ক্ষেত্রে তার ভুল হতেই পারে, কিংবা হয়েছেও। কিন্তু তার ভুল নিয়ে যে পরিমাণ জল ঘোলা হচ্ছে তা মোটেই কাম্য নয়। আমি ভয় করি, এই ঘোলা জলে তলিয়ে যাবে, হারিয়ে যাবে অগণিত তরুণ। দ্বীনের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে আমাদের যেকোনো মূল্যে এই ঘোলা জলকে পরিষ্কার করতে হবে। যদি এমনটা সম্ভব না হয়, তবে তরুণ প্রজন্মের বিশাল একটি অংশ যারা দ্বীন ইসলামের প্রতি নরমদিল, তা কঠোরতার দিকে মোড় নিবে। দীর্ঘমেয়াদে এই ধরণের ঘোলাটে পরিস্থিতির ফলাফল কখনই ইতিবাচক হবে না, কখনই না।
আমার গত কয়েক দিনের পর্যবেক্ষণ বলে, এই ঘোলা জলের কারণে মিটিমিটি জ্বলতে থাকা সেক্যুলার শিক্ষায় শিক্ষিত দ্বীনের প্রতি নরমদিল অগণিত তরুণ প্রজন্ম আজ এক বিশাল অনিশ্চয়তা ও দোদুল্যমান অবস্থার মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করছে। কারণ পূর্বেই বলেছি, মানুষ যখন নিজেদের সাথে অন্যের সাদৃশ্য পায় তখনই তাকে অনুসরণ করে। তাছাড়া, ইসলামি ঘরনার মধ্যেই একজন সম্মানিত আলেমের দ্বারা অন্য একজন অনুজ, পুত্রতুল্য দ্বীনের দাঈয়ের প্রতি বিদ্বেষমূলক আচরণ তারা কখনই ইতিবাচকভাবে নেয়নি। এমনকি তার পক্ষে অন্যান্য সমমনা সম্মানিত শায়খদের সেক্যুলার ও পক্ষপাতদুষ্ট মিডিয়ার অযাচিত বক্তব্যকে আমলে নিয়ে তাদের নিজেদের অবস্থানকে জাস্টিফাই করার চেষ্টা এমনকি তার ব্যক্তিজীবন এবং তার আহলিয়াকে নিয়ে গুরুতর অপবাদ দেয়ার প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী ও সম্পূর্ণ নেতিবাচক। আমাদের সকলের সুস্পষ্টভাবে মনে রাখা উচিৎ ইসলাম শুধু আলেমদের নয়, আলেম-আওয়াম নির্বিশেষে ইসলাম সকলের।
বর্তমান সময়ে সেক্যুলার শিক্ষায় শিক্ষিত তরুণদের কাছে শায়খ মিজানুর রহমান আজহারির পর পরিচিত একজন ব্যক্তিত্ব আবু ত্বহা মুহাম্মাদ আদনান। যাকে দেখে জেনারেল শিক্ষায় শিক্ষিত তরুণ প্রজন্ম তার মতো হওয়ার স্বপ্ন দেখে। কারণ তারা জানে, আবু ত্বহা মুহাম্মাদ আদনান তাদেরই সগোত্রীয় একজন। তিনি যখন জেনারেল শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েও দ্বীনের খেদমতে এইরূপ অবদান রাখতে পারছেন সেহেতু প্রতিটি সেক্যুলার শিক্ষায় শিক্ষিত তরুণও বিশ্বাস করতে ও স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে তাদের দ্বারাও দ্বীনের খেদমতে কিছু অন্তত করা সম্ভব। দ্বীনের একজন দাঈ হওয়া সম্ভব। তরুণ প্রজন্মের এমন সৎ বিশ্বাস নষ্ট করার অধিকার দুনিয়ার কারও নেই।
আমাদের সম্মানিত গুটিকয়েক আলেমের অদূরদর্শী বক্তব্য ও তাদের অনুসারীদের দ্বারা যখন এমন অকল্পনীয় বিদ্বেষের ছড়াছড়ি তখন একটি নির্মম ইতিহাসের পাঠ স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। আপনাদের নিয়ে ঘুরে আসতে চাই ইতিহাসের এমন এক অন্ধকার গলি থেকে যার পুনরাবৃত্তি মুসলিম উম্মাহ হিসেবে আমরা কখনই চাই না।
ষোড়শ শতাব্দীর শুরুর দিকের কথা। খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে তখনও ক্যাথলিক ও প্রটেস্ট্যান্ট নামক বিভেদের ফাটলের জন্ম হয়নি। সেই সময়ে খ্রিস্টান ধর্মের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে ছিল একমাত্র ক্যাথলিক জনগোষ্ঠী। তৎকালীন ক্যাথলিক মানুষজন ছিল প্রচণ্ডরকম ধর্মভীরু। তারা সর্বদা ধর্মীয় অনুশাসনকে মেনে চলার চেষ্টা করতো। আরও একটি বিষয় হচ্ছে, তৎকালীন সময়ে বাইবেল ইংরেজি ছিল না, তা ছিল সম্পূর্ণ হিব্রু ভাষায় রচিত। আর সাধারণ মানুষজন হিব্রু জানত না। আর জানলেও ধর্ম গ্রন্থ পাঠের অনুমতি সর্ব সাধারণের ছিল না। একমাত্র পাদ্রীদের বাইবেল পাঠের অধিকার ছিল। পৃথিবীর সর্বত্র বসবাসরত সকল খ্রিস্টানদের কেন্দ্রীয় ধর্মগুরু হিসেবে পোপের বসবাস ছিল রোমে। সে তার একক ক্ষমতায় বিভিন্ন খ্রিস্টান প্রধান অঞ্চলে আর্চ বিশপ নিয়োগ দিতেন। এই বিষয় থেকে স্পষ্ট, ধর্মগুরু হিসেবে তখনও পোপ শ্রেণির প্রবল আধিপত্য বিদ্যমান ছিল।
তৎকালীন সময়ে যেহেতু সাধারণ মানুষদের ধর্মগ্রন্থ পাঠের অনুমতি ছিল না এবং সাধারণ মানুষজন হিব্রু ভাষায় পারদর্শীও ছিল না সেহেতু সেই পাদ্রীশ্রেণি এই সুযোগের সম্পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে। তারা নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী গসপেল সমূহের পরিবর্তন, পরিবর্ধন করে বাইবেলের অনুবাদ করা শুরু করে। তাদের হীন কর্মকাণ্ডকে প্রকাশ্যে নিয়ে আসবে, তাদের ভালো সেজে থাকার কালো মুখোশ উন্মোচন করবে এমন কেউ ছিল না বললেই চলে। ধর্ম নিয়ে এমন অনিয়ম আর জোচ্চুরি হয়ত এভাবেই চলতে থাকত যদি সেই সময়ের সৎ ক্যাথলিক পাদ্রী মার্টিন লুথার এগিয়ে না আসতেন। অসৎ পাদ্রীদের ব্যাপারে তিনি আওয়াজ তোলার চেষ্টা করলেও তাকে তেমন গুরুত্ব দেয়া হলো না। ফলে, তিনি তার সমমনা অন্য সকল ন্যায়নিষ্ঠ পাদ্রীদের সাথে পরামর্শ সাপেক্ষে ১৫১৭ সনের দিকে অকাট্য তথ্য প্রমাণাদিসহ অসৎ পাদ্রীদের ভণ্ডামির মুখোশ উন্মোচনের জন্য তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘থিসিস ৯৫’ প্রকাশ করেন। সেখানে অসৎ ক্যাথলিক পাদ্রীদের অন্যায়ের কাচ্চাচিট্টা খুলে যায়।
এই বইয়ের প্রভাবে সাধারণ মানুষজন ক্যাথলিক পাদ্রীদের প্রতি ফুঁসতে শুরু করে। তাদের মনে বিদ্রোহ দানা বাঁধতে শুরু করে। সাধারণ মানুষ ক্যাথলিক চার্চ ও পাদ্রীদের কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে শুরু করে। সাধারণ মানুষের প্রবল দাবী ও সংস্কার আন্দোলনের মুখে ভাঙ্গন ধরে একমাত্র খ্রিস্টান জাতীয়তাবাদী চেতনায়। সেই আন্দোলন থেকে জন্ম হয় খ্রিস্টানদের নতুন একটি সম্প্রদায়ের। সেই সম্প্রদায়ের নাম, প্রটেস্ট্যান্ট। এই আন্দোলনের মাধ্যমে প্রটেস্ট্যান্টরা আদায় করে নেয় নিজেদের ধর্মগ্রন্থ নিজেরা পাঠ করার অধিকার।
তৎকালীন প্রটেস্ট্যান্টরা এই আন্দোলনে কতটা লাভবান কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তা আমাদের নিবন্ধের আলোচ্য বিষয় নয়। আমাদের আলোচ্য বিষয়, এমন বিভেদের ফাটল যেন মুসলিম উম্মাহর মধ্যকার বিভাজনের কারণ না হয়। শুধুমাত্র আলেম দিয়ে যেমন উম্মাহ নয়, তেমনি শুধুমাত্র অনুসারী দিয়েও উম্মাহ নয়। আলেম এবং অনুসারী সকলের সমষ্টিই হচ্ছে মুসলিম উম্মাহ।
সারা বিশ্বের অধিকাংশ মুসলিম ইতিমধ্যেই যেখানে সেক্যুলার সিস্টেমের অংশ হয়ে গিয়েছে সেখানে আলেমদের উচিৎ সাধারণ পড়ুয়া দাঈদের দ্বীন ইসলামের খেদমতের সুযোগ দেয়া। আবু ত্বহা মুহাম্মাদ আদনানদের মতো দ্বীনের দাঈদের সাথে বিদ্বেষমূলক আচরণ ও তাদেরকে আবর্জনা জ্ঞান করে ভাগাড়ে ছুঁড়ে ফেলার মাধ্যমে সমস্যার কোনরূপ সমাধান হবে না বরং তা আরও প্রকট আকার ধারণ করবে।
আমাদের সম্মানিত আলেমদের শীতল মস্তিষ্কে উপলব্ধি করা উচিৎ, একজন সাধারণ পড়ুয়া দ্বীনের দাঈ সেক্যুলার মুসলিমের প্রয়োজন যতটুকু অনুভব করবে একজন একাডেমিক আলেম ততটা পারবেন না। কারণ তিনি সেই পথে কোনোদিন হাটেননি, যে পথে হারিয়ে যাচ্ছে উম্মাহর প্রাণ, উম্মাহর শক্তি তরুণ প্রজন্ম। একজন আলেমের জ্ঞান অবশ্যই অবশ্যই বেশি কিন্তু একজন সাধারণকে কীভাবে দ্বীনের দাওয়াত দেয়া হলে তার অন্তরে বেশি দাগ কাটবে সেটা একজন সগোত্রীয়-ই ভালো উপলব্ধি করতে পারেন। আমাদের জেনারেল পড়ুয়া অনেক দাঈয়ের দ্বীনি জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। দ্বীনি জ্ঞানের গভীরতা কম হওয়ার দরুন তাদের দ্বারা অনিচ্ছাকৃত ভুল সংঘটিত হওয়াটা অনেক স্বাভাবিক একটি বিষয়।
একজন আলেম যেমন ভুল করতে পারেন, একজন দাঈও ভুল করতে পারেন। বিশেষ করে জেনারেল পড়ুয়া দাঈরা আরও বেশি ভুল করতে পারেন। মানুষ হিসেবে করা ভুলের জন্য তাদের অবদানকে একেবারে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য তাদের সাথে দূর দূর ব্যবহার, তাদেরকে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করার কোনো মানে হয় না। বরং তাদেরকে ভুলগুলোকে পিতৃস্নেহে পূর্ণ আন্তরিকতার সাথে শুধরে দেয়ার মধ্যেই উম্মাহর বৃহত্তর কল্যাণ নিহিত রয়েছে।
এই কয়েকদিনের আবু ত্বহা মুহাম্মাদ আদনান ইস্যুতে সাধারণ অনুসারীদের পক্ষ বিপক্ষে বিতর্ক, গলাবাজি, গালাগালি আর সম্মানিত আলেমদের অসহনশীল আচরণ এই বিশাল দাওয়াতি ক্ষেত্রকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে দুই পক্ষের অনুসারীরা কিছু আলেমসহ আবু ত্বহা মুহাম্মাদ আদনানকে খারেজী, জ ঙ্গী, ই হু দী দের দালাল, গোপন এজেণ্ডা বাস্তবায়নকারী প্রমাণ করতে ব্যস্ত, অন্যদিকে আরেকদল তাকে ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে মনে করতে শুরু করেছে। অনুসারীরা যেমন তেমন সম্মানিত আলেমদের কাছ থেকে এমন বক্তব্য মেনে নেয়া যায় না। সম্মানিত আলেমদের কাছে থেকে এইরূপ অসহনশীল আচরণের ফলে, অনুসারীরা যা ইচ্ছা তাই ব্যবহার করছে। যা উম্মাহর জন্য এক অশনিসংকেত।
এমন বিরূপ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের ফলে, সেক্যুলার সিস্টেমের শিকার নরমদিল মুসলিমের অন্তরকে কঠোরতার দিকে ধাবিত করছে। এই ধরনের দলাদলি কোনো কালেই ইতিবাচক কিছু বয়ে আনেনি, ভবিষ্যতেও আনবে না। বিশেষ করে, সম্মানিত আলেমদের কিছু কিছু কথাবার্তা, শব্দ চয়ন, বিদ্বেষমূলক আচরণ এবং নিজ অবস্থানে অনড় থাকার দরুন তাদের অনুসারীদের প্রতিক্রিয়া উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং তা অনেক ক্ষেত্রেই অকথ্য ভাষায় রূপ নিচ্ছে।
এই ঘটনার পর আমি এমন অনেকের কথা জানি যাদের বক্তব্য- কুরআন এবং হাদিস নিজে পড়ি সেখান থেকেই আমল করার চেষ্টা করি। আজ তারা বারো মনিষীর বারো মত নিয়ে বাড়াবাড়ি করার চেয়ে নিজেদের উপর তারা বেশি আস্থা রাখছে। আপনারা সম্মানিত আলেম হয়েও বিদ্বেষমূলক আচরণের দ্বারা নিজেদের সম্মান ও গ্রহণযোগ্যতা নিজেরাই ভূলুণ্ঠিত করছেন। তাদের বক্তব্যের ধরণ থেকে কী উপলব্ধি করতে পারছেন? ঠিক এমনটাই ঘটেছিল পাঁচশত বছর পূর্বের প্রটেস্ট্যান্ট আন্দোলনের সময়।
আমি এক অযোগ্য, অকর্মণ্য হয়েও সম্মানিত আলেম হিসেবে আপনাদের সকলের কাছে অনুরোধ করছি, যাবতীয় রেষারেষি বাদ দিন। প্রতিটি মানুষের ভুল হয়, জবান পিছলেও অনিচ্ছাকৃত অনেক কথা বের হয়ে যায় সেই কথাগুলো ফিরিয়ে নিলে তার কোনোরূপ সম্মানহানি হয় না বরং দুনিয়া ও আখিরাতে তার সম্মান আরও বৃদ্ধি পায়। আমরা সেই সম্মানটাকে আঁকড়ে ধরে বিদ্বেষটাকে ভাগাড়ে ছুঁড়ে ফেলি। আমি বিশ্বাস করি, এতেই কল্যাণ রয়েছে।
অন্যসকল নিরপেক্ষ আলেমের উচিৎ এই বিষয়ে কথা বলা। এমন একটি স্পর্শকাতর বিষয়ে আপনার নিশ্চুপ থাকার ফলে নীরব বিপ্লব না ঘটে যায়, যে বিপ্লব আমরা চাই না। আপনারা আলেম, এই আপনারাই সমাজের সর্বোচ্চ সম্মানিত ব্যক্তি। আল্লাহর ওয়াস্তে অনুগ্রহ করে আপনারা জেনারেল শিক্ষায় শিক্ষিত ভাইদের দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েন না, তাদের ভুলগুলোকে বড় করে দেখে তাদের দ্বীনের সকল খেদমতকে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করবেন না। তাদেরকে পূর্ণ আন্তরিকতার সাথে গ্রহণ করুন, তাদের ভুলগুলো পিতৃস্নেহে শুধরে দিন। এটাই ইনসাফ, এটাই দ্বীন ইসলামের দাবী।
আল্লাহর ওয়াস্তে দ্বীনকে নিজেদের কুক্ষিগত সম্পত্তি মনে করবেন না। সাধারণ দাঈদেরকে দ্বীন ইসলামের খেদমত করার সুযোগ দিন। আজ যদি তাদেরকে ও তাদের খেদমতকে আস্তাকুরে নিক্ষেপ করেন, তাদেরকে দূরে ঠেলে দেন, তবে নতুন করে কেউ আবু ত্বহা মুহাম্মাদ আদনান হওয়ার স্বপ্ন দেখবে না। আর কেউ সাজিদ হতে চাইবে না। দলাদলির বদৌলতে সেই পথ রুদ্ধ হয়ে যাবে। সমাজের ভবঘুরে হিমুদের ভিড়ে বিশ্বাসী সাজিদরা হারিয়ে যাবে, বিলীন হয়ে যাবে।
বর্তমানের এই ঘোলা জল অতিদ্রুত পরিষ্কার করুন। নতুবা সমাজের স্বপ্নবাজ তরুণদের স্বপ্নভঙ্গের দায় আপনাদেরকেই নিতে হবে, অবশ্যই নিতে হবে। এই সমাজে হিংসা, বিদ্বেষ ও বিভেদকে বাঁচিয়ে রাখার ফলে ভুল করেও যদি খ্রিস্টানদের ন্যায় প্রটেস্ট্যান্ট শ্রেণির উদ্ভব হয় তবে এর দায় আলেম হিসেবে আপনাদের উপরই বর্তাবে, অবশ্যই বর্তাবে।
আবু ত্বহা মুহাম্মাদ আদনান ও একটি অশনিসংকেত

0 Comments